অবহেলায় প্রবীণ জনগোষ্ঠী

0

গুরুজন ডেস্ক
‘মাগো, গরিবের পোলা নাই, গ্রামে একবেলাও খাইতে পাইতাম না। এক পোলার লগে ঢাকা আইছি। অহন প্রতিদিন ১০০ ট্যাকা না দিলে হেরা (ছেলে) আমারে খাইতে দেয় না।’ বলছিলেন বৃদ্ধ আসির উদ্দিন। ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ ব্যক্তিটি রাজধানীর মিরপুর সড়কে ভিক্ষা করেন। সারা শরীর থর থর করে কাঁপে। লাঠিতে ভর দিয়েও ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেন না। শুধুমাত্র দুমুঠো ভাতের জন্য এই বয়সেও তাকে ভিক্ষা করতে হয়।

বারডেম হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসতেন রাহেলা বেগম (৭০)। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে অস্থির লাগত তার। একদিন লাইন ভাঙার অপরাধে গার্ড ধমক দিয়েছিল। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েই ডাক্তার দেখাতেন। কিন্তু একদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মাথা ঘুরে পড়ে যান রাহেলা। এরপর থেকে তিনি আর বারডেমে যান না।

আসির উদ্দিন বা রাহেলা বেগমদের মতো দেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। প্রবীণরা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সবচেয়ে অবহেলায় রয়েছেন তারা। তাদের সার্বিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হলেও এদেশে সে সুযোগ-সুবিধার কোনো বালাই নেই। যার কারণে সমাজে প্রতিনিয়ত হেয় হতে হচ্ছে প্রবীণদের। ঘর থেকে বাইরে গেলেই চোখে পড়ে নানা বয়সী প্রবীণদের রিকশা চালাতে, ঠেলাগাড়ি ঠেলতে কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো সেবা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই সমাজ বিনির্মাণের অগ্রসৈনিক দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নানা সমস্যা সমাধানে দাবি উঠেছে একটি প্রবীণ নীতিমালা করার। যেখানে ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের দেশের ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। তাদের জন্য নেয়া হবে সামাজিক সুরক্ষামূলক নানা কর্মসূচি।

দেশে প্রবীণদের সংখ্যা ১৯৮১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৯০ হাজার। ১৯৯১ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখে। বর্তমানে এক কোটি ২৫ থেকে ৩০ লাখ প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছে দেশে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৮০ লাখে।

বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৭ ভাগই প্রবীণ। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা হবে ১০ ভাগ।

হেলপ এইজ ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ এর কার্ন্টি ডিরেক্টর নির্ঝরিনী হাসান বলেন, প্রবীণ জনসংখ্যার বাৎসরিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ দশমিক ৪১ ভাগ। এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরে উন্নয়নশীল দেশে মোট জনসংখ্যার ১৯ ভাগ হবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বে এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রূপান্তর ব্যক্তি, সমাজ, জাতীয় ও আর্থ-সামাজিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কারণ প্রবীণ ব্যক্তিরা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভোগেন এবং বার্ধক্য বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ এই জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত কি না- সেটাই বড় প্রশ্ন!

অধিকাংশই দরিদ্র ও বঞ্চিত: রাহেলা বেগম, আসির উদ্দিনের মতো দেশের শতকরা ৮০ ভাগ প্রবীণই দরিদ্র। এরা অর্ধাহারে-অনাহারে, স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দেশে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রবীণরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। যারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, বয়সের ভারে তারাই আবার কর্মহীন হয়ে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৭ শতাংশই বাস করেন গ্রামে। এরা দরিদ্র, নিরক্ষর, অসহায়, স্বাস্থ্যহীন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত ও বিচ্ছিন্ন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, উন্নত বিশ্বে প্রবীণরা পেনশন পান, ভাতা পান। তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আছে। যাদের ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রয়োজন হয়, তাদের জন্য ‘হোম’ আছে। তারপরেও উন্নত বিশ্বে পরিবারের লোকজনকে প্রবীণদের যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে এসব কিছুই নেই। আমাদের দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে কিন্তু সেখানে প্রবীণদের কোনো জায়গা নেই। সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেই। কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ধনী বা উচ্চবিত্তের প্রবীণদের জন্য রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেও গরিবদের জন্য এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here