নারী প্রতিনিধিত্ব যেন প্রতীকী না হয়

0

আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে- নির্বাচন কমিশনে পাঠানো আওয়ামী লীগের এই চিঠি দলটির নারী নেতাকর্মীদের আশান্বিত করবে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও মনে রাখা যেতে পারে, চিঠিটি নির্বাচন কমিশনের তাগিদের জবাব মাত্র। বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে এই অনুপাতে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আমাদের মনে আছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো নিবন্ধিত হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই। আশার কথা, এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় ১৯ শতাংশ নারী। অন্যান্য রাজনৈতিক দল কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে রয়েছে। আমরা আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো এই কোটা পূরণে সচেষ্ট ও সফল হবে। কিন্তু কেবল কোটা পূরণই শেষ কথা হতে পারে না। রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্যই গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে এই বিধান রাখা হয়েছে। অস্বীকারের অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন বিশ্বব্যাপীই প্রশংসা পেয়ে আসছে।

বিশেষত, রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আমরা যেভাবে নারীর ‘ক্ষমতায়ন’ দৃশ্যমান করতে পেরেছি, তা অনেক উন্নত বিশ্বেও বিরল বৈকি। গত আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে আমরা একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়ে এসেছি। বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবেও পেয়েছি একজন নারীকে। ঘটনাচক্রে সংসদের বাইরে থাকা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাও একজন নারী। সংসদে, মন্ত্রিসভায়, প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত নারী কোটার বাইরেও সাধারণভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং নির্বাচিতও হয়। বস্তুত দেশে নারীর ক্ষমতায়ন বা লিঙ্গ সাম্য-সংক্রান্ত নীতি ও কাঠামোগত ব্যবস্থা মন্দ নয়। আমরা দেখেছি, নারী স্বাস্থ্য বিশেষত, প্রসূতি ও মাতৃমৃত্যু হারও অনেক কমেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর তো বটেই, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাড়ছে এবং ঝরে পড়ার হার ক্রমাগত কমছে। কর্মক্ষেত্রেও কমছে নারী-পুরুষ বৈষম্য। একসময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীতে উচ্চপদে নারীরা নিয়োগ হলেও সৈনিক বা কনস্টেবলের মতো পদে ছিলেন না। গত কয়েক বছরে সেই অর্গলও ভাঙা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ তো বটেই, সেনাবাহিনী, বিজিবির সৈনিক পদেও নিয়োজিত হচ্ছেন নারী। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা কতখানি প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারছেন, সেই প্রশ্ন রয়েই গেছে। নারী নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলেও শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আদতে নারী বান্ধব কি-না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরও নারী হিসেবে বঞ্চনার কথা আমরা শুনে থাকি। আমাদের মনে আছে, এ বছরের গোড়ার দিকে এক আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকারের নারী সদস্যদের তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন। দেশে যদিও নারীর ক্ষমতায়ন বা লিঙ্গ সাম্য-সংক্রান্ত নীতি ও কাঠামোগত ব্যবস্থা মন্দ নয়; কিন্তু নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং তার মজুরির আর্থিক স্বীকৃতি এখনও বহুলাংশে অধরা থেকে গেছে। আমরা আশঙ্কা করি, সমাজে ও পরিবারে পুরুষতন্ত্রের যে দীর্ঘ আধিপত্য, তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও ছায়া বিস্তার করে থাকে। সে কারণে নীতিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যবহারিক ভাবেও নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান করে তোলার বিকল্প নেই। রাজনীতি সে ক্ষেত্রে উপযুক্ত ক্ষেত্র। কারণ রাজনীতিই অন্যান্য খাতকে প্রভাবিত করে থাকে। কিন্তু এখানেও যদি নারীর অংশগ্রহণ কেবল আলঙ্কারিক হয়, তাহলে পুরুষতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়া অপসারণ সহজ হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here