জীবন যুদ্ধে জয়ী গৃহবধু শাহানাজের স্বাবলম্বী হওয়ার নেপথ্যের গল্প

0

জাগো বাংলা ডেস্ক:
মর্জিনা বেগম একটি সেলাই মেশিন জীবনের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে উচ্চ শিক্ষিত গৃহবধু শাহনাজ বেগমের। কর্মদক্ষতা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।

বরিশাল নগরীর কাশিপুর এলাকার বাসিন্দা শাহনাজ। জীবন সংগ্রামে জয়ী এ নারীর মনে আছে তার অদম্য সাহস আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ। তার সাথে আলাপ করে জানা যায়, নিজেকে নারী উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তোলার নেপথ্যের কাহন।

আজ থেকে ২৭ বছর আগে ১৯৯০ সালে শাহানাজ বেগম বিএ পাশ করেন। ওই বছরই তার বিয়ে হয় বিক্রমপুরবাসী ব্যবসায়ী মোঃ নজরুল ইসলামের সাথে। বিয়ের পর প্রথমে তিনি একটি বেসরকারী সংস্থায় এবং পরে ঢাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকুরী নেন। কিন্তু বাঁধ সাধে স্বামী। চাকুরিটা স্বামীর পছন্দ নয়। তাই এক রকম স্বামীকে খুশি রাখতে চাকুরি ছেড়ে ১৯৯৬ সালে বরিশালে চলে আসেন। বৈবাহিক জীবনে তাদের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। নানা চড়াই-উৎড়াই পেড়িয়ে মনস্থির করেন কারিগরি শিক্ষাকে কাজে লাগাবেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। সে সময় তার মুলধনের অভাব ছিল প্রকট। তখন এলাকার মানুষের কাছ থেকে শুনে শাহনাজ ব্রাক’র ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেন।

তারপর ১৯৯৭ সালে প্রাথমিকভাবে তিনি মাত্র পনের’শ টাকা সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ গ্রহন করেন। সেই টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনে নিজের ঘরেই দর্জিও কাজ শুরু করেন। এভাবে নামমাত্র মজুরী নিয়ে প্রাথমিক ভাবে ২বছর কাজ করেন।

তারপর ২০০৩ সালে ৩০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহন করে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্যবসায় নেমে পড়েন। ২০০৯ সালে কাশিপুর বাজারে শাহনাজ টেইলার্স এন্ড ক্লোথ স্টোর নামে দোকান স্থাপন করে নিজেই তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে টেইলারিং এর কাজ এবং কাপড় বিক্রি আরম্ভ করেন। তার এ সকল মহৎ ও পরিশ্রমী কাজের পেছনে স্বামী নজরুল ইসলামের অবদান আর উৎসাহ ছিল প্রচুর। তারপর সংসারে যখন একটু সুখের পরশ আসতে শুরু করলো ঠিক সেই মুহুর্তে ঘটলো দুর্ঘটনা। স্বামী নজরুল ইসলাম আকষ্মিকভাবে ২০১১ সালে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুতে শাহানাজ কিছুটা ভেঙ্গে পড়লেও কখনো মনোবল হারাননি। শোককে শক্তিতে পরিনত করে একমাত্র মেয়ে শামিমা নাজমিম অপুকে ডাক্তার হিসাবে দেখার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নতুন উদ্যামে কাজ শুরু করেন।

বর্তমানে তিনি ব্যবসার পাশাপাশি বরিশাল মহিলা টিটিসিতে প্যাটেন টিচার হিসাবে কাজ নেন। সেখানে তিনি সপ্তাহে তিন দিন দর্জি কাজের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। এছাড়াও নিজের বাসায় এবং রায়পাশা-কড়াপুরে ভাড়া বাসায় নিজের পরিচালিত মেয়েদের জন্য দু’টি ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলেন।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ট্রেনিং সেন্টার থেকে প্রতিমাসে তার উপার্জন হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মত। উপার্জিত এ অর্থ দিয়ে মেয়ের ডাক্তারী পড়ার খরচ বহন ছাড়াও তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৬ জন নারী কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং ব্র্যাকের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। সব খরচ মিটিয়ে শাহানাজের হাতে মুনফা থাকে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এই অর্জিত মুনফা দিয়ে শাহানাজ বেগম তার গ্রামের বাড়ী বরিশালের হিজলা উপজেলায় ২০ একর ধানের জমি কিনেছেন। তার কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে শাহনাজ বেগম আজ সফল একজন নারী উদ্রোক্তা। সেই সাথে আদরের মেয়েকে নিয়ে দেখা স্বপ্নও পূরন হয়েছে। তার মেয়ে শামিমা নাজমিম অপু এবছর (২০১৭) নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছে। এখন চলছে তার বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার প্রস্তুতি।

শাহনাজ বেগম নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তাদেরকে বিদেশে না পাঠিয়ে দেশে বসে কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে ব্যবসায় উদ্যোগী করা প্রয়োজন। এতে করে নারীরা তার নিজের এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরী হলে দেশ স্বাবলম্বী হবে।

শাহানাজের আজকের সফলতার পেছনে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক’র ”ব্যবসায়ী ঋণ“ প্রদান অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। এব্যাপারে কথা হয় ব্র্যাকের জেলা প্রতিনিধি রিপন চন্দ্র মন্ডল এবং কাশিপুর এলাকা ব্যবস্থাপক অনিমেষ কুমার বিশ্বাসের সাথে। তারা জানিয়েছেন, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আগ্রহী এবং কঠোর পরিশ্রমী নারীদের ক্ষুদ্র ও ট্রেড লোন প্রদান করা হয়ে থাকে।

এভাবে নারীরা যদি কাজ করে স্বাবলম্বী হয় তা হলে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির সাথে সাথে অর্থনৈতিক ভাবে দেশের উন্নয়নে মূল শ্রোতধারায় তাদেরকে নিয়ে আসা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here