নির্যাতিত ছেলেটিই হলো আওয়ামী লীগের সভাপতি

0

সভাপতি পদে এমপি, সাবেক এমপি, শিল্পপতি আর কোটিপতি ধর্ণাঢ্য প্রার্থীদের হটিয়ে অবশেষে শূণ্য ব্যাংক-ব্যালেন্সের মালিক নৌকার পাগল ‘মাইক বাঁধা’ ছেলেটিই হলো মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। দলটির সম্পাদক পদেও এসেছে নতুন মুখ। এ পদে ১২ প্রার্থীর সাথে লড়াই করে সাবেক ছাত্রনেতা মীর সুলতানুজ্জামান লিটন হয়েছেন সাধারণ সম্পাদক। শনিবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম উপেক্ষা করে তিন দশক ধরে ১২ মাস মুজিব কোট গায়ে দিয়ে আসছেন তিনি। কর্মীরা বলছে নৌকা ছাড়া কিছুই বোঝে না তাদের এই মুজিব সেনা। তবে, সারা জীবন আওয়ামী লীগ করলেও সংগঠনে তার যোগ্য স্থান হয়নি অথচ ঝিনাইদহের মহেশপুর আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কান্ডারি ছিলেন তিনি। একাই মাইক টানিয়ে একাই বক্তব্য দিতেন দলটির দু:সময়ে। সেই আশির দশকে মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের এমন দিনও ছিল।

সরেজমিন মহেশপুর ঘুরে ও সেখানকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দুঃসময় গেছে। এ সময়, সাংগঠনিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, নৌকা প্রতীকের ভোট ছিল মাত্র ২০-২৫ হাজার। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে মইনুদ্দিন মিয়াজী এখানে এমপি নির্বাচিত হয়। তবে, ৭৫ সালের পর থেকে সুদীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকে। ২০০৮ সালের পর অবশ্য ৩ বার এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের জোয়ার বইছে এই আসনে। এই সুযোগে এখানে অনুপ্রবেশকারীরা দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছে। কিন্তু দলের দুর্দিনের যারা সাথী ছিল এমন অনেকের ভ্যাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। এর মধ্যে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ ছিল তারই একজন।

জানা গেছে, ১৯৭৭-৭৮ সালে কোটচাঁদপুর থানা ছাত্রলীগের মাধ্যমে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ ছাত্র রাজনীতি শুরু। ১৯৭৮ সালে মহেশপুরের পার্শ্ববর্তী কোটচাঁদপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত সাজ্জাদ। এরপর থেকে মুজিব কোট পরা শুরু করেন। তিন দশক ধরে ১২ মাসই সেই কোট গায়ে দেন। রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম কোনো কিছুই বাধা মানে না।

১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত  রাজনীতি করতে যেয়ে সাজ্জাদুল ইসলামকে জেল-জুলুম, অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৮৭ সালে ২৭শে অক্টোবর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় আটক হয়ে ৭ থেকে ৮ মাস জেলে থাকেন মুজিব আদর্শের সৈনিক সাজ্জাদ হোসেন। এ সময়, তার পিতা মদি উদ্দিন সরদার মারা গেলেও দাফন করতে পারেননি।

১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাজ্জাদ। এ সময়, দলের সাংগঠনিক অবস্থা আগের থেকে মজবুত হয়। ২০১২ সালে ইউপি নির্বাচনে মহেশপুর উপজেলার এসবিকে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচি হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দলের জন্য জীবন-যৌবন শেষ করলেও এমপি ও উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়েও বঞ্চিত হন সাজ্জাদ। কিন্তু, তৃণমুল কর্মীরা বলছে, ইতিহাস সাক্ষী দেয় ৯০ সালের পূর্বে মহেশপুর পুরাতন পৌরসভার সামনে শেখ নিজাম উদ্দিনের সভাপতিত্বে একাই মাইক বেঁধে একাই বক্তব্য দিতেন এই নেতা। পথচারীরা ছাড়া বক্তব্য শোনার কেউ  ছিল না। তখন হাল ধরার মত তেমন কোনো নেতা-কর্মী ছিলেন না যারা ছিলেন তারা সামনে আসতে ভয় পেতেন।

৯০ দশকের পরে মহেশপুর পৌর আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক বুলু, ইব্রাহিম আলম, শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা রিপন খাঁন, মীর সুলতানুজ্জামান লিটন, পলাশ খাঁন, যুবলীগ নেতা শরিফুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ সহ উদীয়মান ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতা-কর্মী সক্রিয় হলে তার সহযাত্রী বৃদ্ধি পায় । আওয়ামী লীগ প্রসারিত হয়। দীর্ঘ ৩ দশক পর অবশেষে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তাকে মূল্যায়ন করলো।

৩০শে নভেম্বর মহেশপুর উপজেলা সম্মেলনে প্রথম পর্ব শেষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই এমপি দ্বিতীয় পর্বে বক্তৃতার শুরুতেই বলেন‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলের সভানেত্রী অনুমোদিত ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি এখন ঘোষণা করা হবে। কেন্দ্র থেকে এই কমিটির নাম হাতে দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপনের হাতে, তিনি আমাকে এই কমিটি ঘোষণা করতে বলেছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তা আপনাদের সামনে ঘোষণা করছি’’।

এ সময় মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদের নাম। এর পরপরই, তৃণমুলের নেতা-কর্মীরা সাজ্জাদকে কাঁধে তুলে নিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন।

সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদের কাছে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি বলেন, ‘এক সময় দলে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা এত পরিমাণ বেড়ে যায় যে টিকতে না পেরে সাংবাদিকতায় ঝুঁকে পড়েন। জাতীয় দৈনিক আমাদের সময়ে গত এক দশক ধরে জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাশাপাশি ছাড়েননি প্রিয় দলটিকে। তিনি জামায়াত অধ্যুষিত মহেশপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগকে আরও সংগঠিত করতে দলের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here